আজ- শনিবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মানুষকে এখনও মাস্ক পরাতে বাধ্য করতে হবে

কারও আত্মহত্যা করার অধিকার আছে কিনা সেটা নিয়ে দীর্ঘ দার্শনিক বিতর্ক পৃথিবীতে চলেছে, সেটি শেষ হয়নি এখনও। বাংলাদেশ এই বিতর্ক-আলোচনা খুব একটা না হলেও পারিপার্শ্বিক আলোচনা থেকে বলা যায়, ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণে আত্মহত্যার নৈতিক অধিকার মানুষের নেই– এটা বিশ্বাস করে প্রায় সব মানুষ।

এরপরও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এবং প্রতি বছর বাড়ে সেই সংখ্যা। কেউ আত্মহত্যা করে সফল হতে পারলে জাগতিক আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়। কিন্তু তিনি যদি সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি বাংলাদেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা মতে, যদি আপনি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নেন এবং অনুরূপ অপরাধ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে কোনও কাজ করেন তাহলে আপনার ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। অথবা উভয় শাস্তিই হতে পারে। করোনার মধ্যে মানুষের বেপরোয়া চলাচল দেখে আত্মহত্যার কথা মনে এলো; কেন এলো সেই প্রসঙ্গে আসছি আরেকটু পরে।

সারা পৃথিবীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। প্রাথমিক ধাক্কা অনেকটা সামলে ওঠা ইউরোপের অনেক দেশে আবার নতুন করে কঠোর লকডাউন দেওয়ার খবর এরমধ্যেই আমরা দেখেছি। বলা হচ্ছে আমাদের দেশেও দ্বিতীয় ঢেউ আসছে শীতকালেই। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন করছেন, আমাদের আর দ্বিতীয় ঢেউ কেন হবে,  প্রথম ঢেউই তো চলছে এখন‌ও।

যাহোক, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা বলছেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলারা বলছেন। এমনকি বলছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও। তিনি এরমধ্যেই বেশ কয়েকবার এর কথা বলেছেন নিয়মিত বিরতিতে।

ঢেউটি প্রথম হোক বা দ্বিতীয়, বৈজ্ঞানিক যুক্তি বলে শীতকালে করোনার প্রকোপ বাড়বে, এটা প্রায় নিশ্চিত। বাড়লে সেটা যথেষ্ট বিপদের কারণ হতে পারে।  শীতকালে মানুষের পানি ব্যবহার করার প্রবণতা কমে যায়। ফলে করোনা থেকে দূরে থাকার জন্য অতি জরুরি চর্চা, ‘হাত ধোয়া’ এই সময়ে অনেক কমে যাবে। এছাড়াও এতদিন উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে করোনাভাইরাস বাইরের পরিবেশে বেশি সময় টিকে থাকতে না পারাটা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছিল। শীতে সেই পরিস্থিতি না থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, শীতের সময়ে মানুষ ঘর, অফিস এবং গণপরিবহনের জানালা বন্ধ রাখতে শুরু করবে। কোনও একটা বদ্ধ জায়গার বাতাসে করোনাভাইরাস অনেক বেশি সময় বাতাসে ভাসতে পারে। ফলে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

শীতকালে করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়াটা অনেক বেশি বিপজ্জনক হবে। বহু মানুষের, বিশেষত বৃদ্ধদের শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ শীতকালে বেড়ে যায়। যারা ক্রনিক কিছু শ্বাসতন্ত্রের রোগের রোগী (ক্রনিক অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, এমফাইসেমা), তারা শীতকালে এমনিতেই এসব রোগের প্রকোপ বাড়ার কবলে পড়েন। সঙ্গে করোনা যুক্ত হলে সেটা আক্রান্তদের জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি বাড়িয়ে দেবে। এছাড়াও আমরা পত্রিকায় দেখেছি ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়েছে, এটাও করোনা আক্রান্তদের ঝুঁকি বাড়াবে।

করোনা নিয়ে সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানের ওপরে এই দেশের বেশিরভাগ মানুষই আস্থা রাখেনি। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকাশিত ডাটার ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টেও দেখা যায়, বাংলাদেশের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে নিচে। কিন্তু এই সরকারি হিসাবেই গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় করোনা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইইডিসিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের তুলনায় গত এক মাসে (২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর) রাজধানীতে নতুন রোগী বৃদ্ধির হার ২০ দশমিক ১৩ শতাংশ। চট্টগ্রাম জেলায় এই হার ১২ শতাংশ আর সিলেটে ১১ শতাংশ। এছাড়া উত্তরের জেলা নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে এক মাসে রোগী বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

অক্টোবর শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে এই বছর শীতের হিমেল হাওয়া আসা দূরে থাকুক, রীতিমতো ভাদ্র মাসের ‘তাল পাকানো’ গরম পড়ছে। তাহলে যৌক্তিকভাবে অনুমান করাই যায়, তাপমাত্রা কমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে করোনার প্রকোপ অনেক বেড়ে যাবে।

শীতকালে এই রোগের প্রকোপ বাড়লে যে বিপদ হতে পারে তার লক্ষণ এরমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে। ৩০ অক্টোবর এক রিপোর্টে বাংলা ট্রিবিউন দেখিয়েছে, ‌ঢাকায় কিছু দিন আগেও করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ খালি আইসিইউ ছিল, তার সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ চরম জটিলতা নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

আইসিইউ বেডের সংখ্যা কমছে এই তথ্যটা দিয়েছি রোগের প্রাদুর্ভাব আবার বাড়ছে এটা বোঝানোর জন্য। এই দেশের মানুষের প্রয়োজনের অনুপাতে আইসিইউ বেড পাওয়া যাবে– এই ‘আকাশ কুসুম কল্পনা’ এখন আর কেউ করে না। শুধু প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পাওয়া যাবে, এটুকুই এখন মানুষের একমাত্র চাওয়া। সেটারও কী ব্যবস্থা করার পরিস্থিতি আছে?

এমনকি আমরা যারা চিকিৎসক নই, তারাও অনেকে জেনে গেছি করোনার শ্বাসকষ্টের জটিলতা হলে অনেক রোগীকে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দিতে হয়, যার জন্য হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা এরমধ্যেই রিপোর্ট করে দেখিয়েছে, আসছে শীতে সরকারের পক্ষ থেকেই করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আছে অবিশ্বাস্য গাফিলতি। জুন মাসে ৭৯টি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। এরমধ্যে ৬১টির কাজই শুরু হয়নি।

উক্ত রিপোর্টে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গঠিত কোভিড-১৯ তহবিলের টাকায় ৩০টি হাসপাতালে গ্যাস পাইপলাইন ও লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের কথা জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বাংলাদেশের। ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা জানান, তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল জুনে। কিন্তু এখনও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। অনুমোদন পেলে নতুন করে আবার প্রস্তুতি নিতে হবে। এতে ৩০টির কাজ শেষ করতে অন্তত ৬ মাস লাগতে পারে।

সরকারকে বুঝতে হবে আইসিইউ থাকুক না থাকুক, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা হাসপাতালে না থাকা সরকারের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। একজন ডাক্তার হিসেবে আমি দেখেছি, বহু রকম উপসর্গ নিয়ে মানুষ ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে না গিয়েও থাকে। কিন্তু তীব্র শ্বাসকষ্ট এমন একটি উপসর্গ, যেটি মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেই। ফলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলে হাসপাতালে বহু মানুষ গিয়ে যদি পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পায়, তাহলে সেটার ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এই শীতে রোগীর অত্যন্ত বড় একটা স্রোত হাসপাতালের দিকে যাবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া আর সবকিছু খুলে দিয়েছে। ঢাকার চারপাশে তাকালেই কেউ বলবে না দেশে করোনা নিয়ে কোনও রকম কোনও সচেতনতা আছে। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটা এখন এই দেশে হাস্যকর। মানুষ মাস্ক পরছে না। এমনকি সরকারের অংশ, পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যকেও দেখা যায় মাস্ক ছাড়া।

সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে যেহেতু আর কিছু করা হচ্ছে না, তাই সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে মানুষকে অন্তত মাস্কটা পরতে বাধ্য করা উচিত। এরমধ্যেই সরকার থেকে জানানো হয়েছে মাস্ক না পরলে কোনও রকম সরকারি সেবা পাওয়া যাবে না। আর সর্বশেষ ঘোষণায় বলা হয়েছে, মাস্ক ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠানে ঢোকাও যাবে না। এই দেশে সরকারি কোনও ঘোষণা কার্যকর করার আদৌ কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কিনা সেটা দেখার জন্য যে কেউ একটা গণপরিবহনে উঠলেই বুঝতে পারবেন। আগেও নানান রকম ঘোষণা দেওয়া এবং সেটা পালন করা না হতে দেখে সর্বশেষ ঘোষণাটিকেও কথার বেশি মনে করার কোনও কারণ নেই।

করোনায় মানুষ এখন যেভাবে বেপরোয়া হয়ে চলাফেরা করছে,‌ তাতে মনে হতেই পারে, অনেকে জেনে-শুনে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন। অর্থাৎ এটা আত্মহত্যা চেষ্টা। শুরুতে যেমন বলছিলাম এই দেশে কেউ আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে মনে হলেও সরকারকে সেটা বাধা দিতে হবে। আমাদের দেশের আইনে আত্মহত্যা করা দণ্ডনীয়।

করোনার এই প্রকোপের মধ্যে মানুষের এমন বেপরোয়া চলাফেরা আসলে আত্মহত্যা নয় শুধু, এটা অন্যকে হত্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। ফলে এটা তার চাইতে অনেক বেশি গুরুতর ব্যাপার। যে ধরনের মাস্ক পরে মানুষ চলাফেরা করে, তার প্রধান শর্ত হচ্ছে সকলে একসঙ্গে পরলেই সবাই প্রায় পুরোপুরি নিরাপদ থাকবেন। আমি পরেছি কিন্তু আরেকজন পারেনি তাতে আমার ওই পারায় খুব বেশি লাভ হয় না। সুতরাং অন্য যেকোন‌ও মানুষের মাস্ক না পরার মাশুল আমি নিজে দিতে পারি জীবন দিয়ে।

সরকারকে বুঝতে হবে প্রায় সব মানুষকে মাস্ক করতে বাধ্য না করা মানে হচ্ছে বহু মানুষকে করোনায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে ফেলে রাখা। এবং এদের কাউকে কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়া হবে না কিংবা প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এই ধরনের নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবেই। মানুষকে গণপরিবহনে এবং বাইরে বেরোলেই মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় আইন করে জরিমানা ধার্য করতে হবে। এখন একটা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাই মানুষকে সচেতন করা, উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টার চাইতে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ‌ করে বাধ্য করাই বেশি জরুরি।

এইমাত্র লিখা কথাগুলো একরকম বাহুল্য, কারণ মানুষকে ন্যূনতম মাস্ক পরাতে কী করতে হবে এটা আমরা সবাই জানি। যেমন জানতাম করোনার শুরুতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু নেওয়া হয়নি তেমন কিছুই।

করোনা নানাক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়ে গেছে। সর্বশেষ জনগণ এটাও দেখলো, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি মানানো দূরেই থাকুক, সরকার এখনও জনগণকে শুধু মাস্ক পরতেও বাধ্য করতে পারেনি।

elive

Read Previous

বাংলাদেশ নিয়ে আনন্দবাজারীয় সাংবাদিকতা!

Read Next

একটি ছোট নদীর দুঃখ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *